Facebook Google Plus Twiter YouTube

ত্রিপুরার প্রবাদ প্রতীম জননেতা নৃপেন চক্রবর্তীর বহু অকথিত জীবনধারার ধারাবাহিক বর্ণনা৷ লিখছেন প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রীর শেষ জীবনের সহায় সাংবাদিক দিবাকর দেবনাথ

দিবাকর দেবনাথ

কট্টর কমিউনিস্ট হয়েও মুখস্ত ছিল গীতার সমস্ত শ্লোক

স্মৃতিকথা/৩

ক'দিন ধরে নৃপেনদা বলছিলেন,"আমার এবার যাবার সময় হয়ে গেছে |ঐ যে লাল ফুলগুলো দেখছ এগুলো যেদিন ঝরে যাবে আমিও তখন মরে যাবো |"দুই নম্বর এম এল এ হোস্টেলের যে ঘরে তিনি থাকতেন তার জানালা দিয়ে একটি বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখা যেতো | অনেক লাল ফুল ফুটতো| তিনি প্রতিদিন দেখে উপভোগ করতেন| আমি বলতাম,কেন মরবেন,আপনার কি মৃত্যুর বয়স হোয়েছে |"একদিন সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে দেখা করে দৈনিক সংবাদ যাব | আমাকে ডেকে বললেন,কাল আসার সময় একটা গীতা নিয়ে এসো | গীতা ! যিনি কখনো ধর্মাচরন করেন নি,যাকে মন্দিরে যেতে কেউ কখনো দেখেনি, তিনি নাকি গীতা খুঁজছেন!কোন ভাবেই মেলাতে পারছি না| অনেক কথা ভাবতে ভাবতে অফিসে গেলাম|পরদিন সকালে একটা গীতা কিনে নিয়ে গেলাম| হাতে দিতেই বেশ কৌতুহল নিয়ে দেখা শুরু করলেন |হঠাত্ বলে উঠলেন,"এটা নয়| একটা ভালো গীতা নিয়ে এসো"| ভালো গীতা? গীতা তো গীতাই|ভালো গীতা আবার কি?বুঝতে পারলাম না| ভূপেনদাকে ঘটনা বললাম |সব শুনে তিনি বললেন,বাজারে যত রকমের গীতা পাওয়া যায় কাল কিনে নিয়ে যেও "|আমিও তাই করলাম|পরদিন 10/12 টা গীতা নিয়ে হাজির হলাম | তিনি দেখতে শুরু করলেন | বেশ মনযোগ দিয়ে| ভাবলাম এবার হয়ে গেছে | সন্ধ্যায় যখন আবার গেছি,তাঁর প্রথম কথা,এগুলি একটাও ভালো না |অগত্যা আবার ভূপেনদাকে জানালাম |একটা গীতাও তো উনার পছন্দ হলো না |4/5দিন পর একদিন সন্ধ্যায় ভূপেনদা আমাকে ডাকলেন |বললেন,কামানচৌমহনী থেকে মটরস্ট্যান্ড যেতে একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান আছে,সেখানে একটা গীতা পাবে ,কিনে দিয়ে এসো | বুঝলাম বিষয়টি ভূপেনদাকেও ভাবাচ্ছিল| কিন্তু হোমিও ওষুধের দোকানে গীতা বিক্রি হয় !খটকা লাগলো | কিনতে গিয়ে বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলাম গীতার রহস্য |তিনি বললেন, গীতার অনুবাদ,ব্যাখ্যা করে অনেকে বের করেছেন |এটাই প্রাচীন গ্রন্থ |প্রবীন এবং পন্ডিতরা এখনো এটাকেই বেশি পছন্দ করেন| একটা নিয়ে গেলাম | প্রথম দর্শনেই তাঁর পছন্দ |
কিন্তু আমার কৌতূহল গেলোনা |একজন আপাদমস্তক কমিউনিষ্টের গীতার কি প্রয়োজন !না কি শেষ বয়সে মনের পরিবর্তন ! জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কি গীতা পড়বেন ? বললেন,শোন,আমার বাবা ছিলেন খুব ধার্মীক মানুষ | ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে কঠোর নিয়ম ছিল,আমরা সব ভাইদের সকালে ঘুম থেকে উঠে আগে স্নান করতে হতো | তার পর শব্দ করে গীতা পাঠ | তারপর খাওয়া,পড়াশুনা,অন্য কাজ | এইটুকু বলেই গীতার শ্লোকগুলি না দেখে বলতে শুরু করলেন |আমি তো অবাক |তিনি গীতার শ্লোকও মুখস্ত বলতে পারেন ! সেদিন নৃপেন চক্রবর্তীকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করলাম | একজন মানুষের এত দিকে জ্ঞান থাকতে পারে !তাই ত তিনি মানুষটা নৃপেন চক্রবর্তী |

 

কমিউনিজমের বিকল্প নেই, শেষ জীবনে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও বুঝিয়েছিলেন অনুগামীদের

 

স্মৃতিকথা/২

আশারামবাড়ীর পাহাড়ী জনপদের এক অখ্যাত বাড়ীতে নৃপেন চক্রবর্তী আসবেন এই বার্তা আগেই রটে গিয়েছিল | বাড়ীতে অসংখ্য মানুষের ভিড় | আশপাশের গ্রাম থেকেও এসেছেন | বেলা ১১টা নাগাদ আমাদের কনভয় পাহাড়ের গা ঘেষে মেঠো পথ ধরে গিয়ে দাঁড়ালো সেই ঐতিহাসিক বাড়ীর সামনে | গাড়ীতে নৃপেনদা আমাকে বলেছেন, এই বাড়ীর কর্তা তাঁর বন্ধু | গাড়ী থেকে নামতেই সব মানুষ এক সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন তাঁকে একবার দেখতে | বাড়ীর লোকেরা এগিয়ে এলেন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে | ঘরের সবচে' ভালো পোষাক পড়ে | তিনি শুধু একজনকেই খুঁজছেন | হাঁটুর উপরে কাটা ধুতি পরা একজন এগিয়ে এসে বললেন,দাদা ত মারা গেছে | দাদা হলেন তাঁর বন্ধু |বহু বছর যোগাযোগ নেই ,তাই কেউ খবর দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি | মুহূর্তে চোখ জলে ভরে গেল তাঁর |আমাকে এক হাতে ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে গেলেন বাড়ীতে |বন্ধুর ছোট ভাইসহ বাড়ীর ছোটবড় সকলে এলেন তাঁকে প্রনাম করতে | যেন বাড়ীতে ঈশ্বরের আবির্ভাব হয়েছে | কিন্তু তিনি তো প্রণাম নেবেন না | সেদিন জানলাম নৃপেন চক্রবর্তী কারো পা ধরে প্রণাম নেন না | পরেও দেখেছি | বন্ধুর ভাই দুপুরের খাবারের আয়োজন করেছেন | ঝকঝকে উঠোনে কলাপাতায় বসে কলাপাতায় খাবার ব্যবস্থা | তাঁর পাশে আমাকেও বসালেন |প্রথমে এলো ডাল আলু ভাজা আর কাঁচা লংকা | পরের মেনু মাংস | বাড়ীর মোরগ কেটেছে | মাংসের রঙ্ দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ ! টকটকে লাল | আমি নৃপেনদার দিকে বারবার তাকাচ্ছি | তিনি বাটি থেকে মাংস পাতে নিয়ে খেতে শুরু করেছেন | দেখি তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে | বুঝতে পেরেছি ঝাল সহ্য করতে পারছেন না | সে সময় তাঁর প্রতিদিনের লান্চ ডিনারের মেনু ছিল এক কাপ ভাত,এক কাপ ডাল,এক কাপ চিনি | রেখা দেববর্মা নামে তাঁর এক আপনজন বাড়ী থেকে এ খাবার নিয়ে আসতেন | আস্তে করে বললাম,মাংস থাক |শুধু ডাল দিয়েই খান | আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,খেতে হবে | এই মাংসের মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে তাদের আবেগ ভালোবাসা শ্রদ্ধা সম্মান | না খেলে তাদের অপমান করা হবে | দেখলাম বার বার চোখের জল মুছে তিনি মাংস খেলেন | খাওয়ার পর বিদায়ের পালা |সে এক অন্য দৃশ্য | সকলের চোখে জল | যেন প্রিয় বিদায়ের ব্যথায় ব্যাকুল পুরো গ্রাম | কয়েকশ মানুষের মাঝে দিয়ে এগিয়ে চললো কনভয় | দেখলাম নৃপেনদার মনটা বড় খারাপ |
আশারামবাড়ী বাজারে এসেই দাঁড়াতে হল | বাজারে কয়েক হাজার মানুষ অপেক্ষা করছেন তাঁর জন্য | তারা আগে থেকেই টেবিল চেয়ার মাইক সাজিয়ে রেখেছেন | তারা প্রিয় নেতাকে দেখতে চান,তাঁর কথা শুনতে চান | জনতার আবদার রাখতে গাড়ী থেকে নেমে গেলেন মন্চে | অনেকে দুঃখ প্রকাশ করলেন তাঁকে পার্টি থেকে বহিস্কার করায় |কেউ কেউ কাঁদলেন | তিনি তাঁদের শান্তনা দিলেন | বললেন,মনে রেখো কমিউনিজমের বিকল্প হয় না | কমিউনিষ্টরাই পারে শোষিত বন্চিত শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে | অবাক হয়ে দেখলাম সদ্য পার্টি থেকে বহিস্কৃত একজন নেতা কি ভাবে তাঁর আদর্শে অবিচল থাকতে পারেন | এবং অনুগামীদেরও মুক্তির পথ দেখাতে পারেন |
বুঝলাম তাই তো তিনি জননেতা,তাই তো তিনি নৃপেন চক্রবর্তী

ভুলেননি কলকাতা থেকে আত্মগোপনে ত্রিপুরায় এসে আশ্রয় নেওয়া সেই সাঁওতাল বাড়ির কথা

 

স্মৃতিকথা/১-

জননেতা নৃপেন চক্রবর্তীর মৃত্যুদিনে তাঁর সঙ্গে অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে | একটি ঘটনা সকলের সঙ্গে শেয়ার করছি,যেখানে আমার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট | সিপিআইএম পার্টি থেকে বহিস্কারের পর,প্রয়াত ভূপেন দত্ত ভৌমিকের নির্দেশে নৃপেন চক্রবর্তীর দেখাশুনার যাবতীয় দায়িত্ব ছিল আমার উপর | সকালের ওষুধ খাওয়া থেকে লেখালেখি,জনসংযোগ,ডিনার অব্দি| দিনে রাতে কমপক্ষে তিনবার যেতে হতো এম এল এ হোস্টেলে | বহিস্কারের ক'দিন পর তিনি বললেন, খোয়াইয়ের আশারামবাড়ী যাবেন | কোলকাতা থেকে ত্রিপুরায় এসে আশারামবাড়ী এক সাঁওতাল বাড়ীতে আত্মগোপন করেছিলেন দীর্ঘদিন| এই বাড়ীতে থেকে উপজাতিদের মধ্যে কমিউনিষ্ট মতাদর্শ প্রচার করতেন | সেই বাড়ীতে তিনি যাবেন| সরকার থেকে তাঁর জন্য একটি এম্বেসেডর গাড়ী এবং দুটি সিকিউরিটি গাড়ী পাঠানো হলো|কিন্তু তিনি সরকারের গাড়ী চড়বেন না|নেওয়া হলো একটি ভাড়া গাড়ী| আমাকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ারা হলেন | একের পর এক অতীত দিনের স্মৃতিচারন করে চলেছেন| আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছি |হু হ্যাঁ ছাড়া আরকিছু বলার পুঁজি আমার নেই |কোন বিষয় শেয়ার করার সাহসও নেই |সিনিয়র সাংবাদিকদের কাছে শুনেছি,নৃপেন চক্রবর্তীর কাছে কোনো বিষয়ে পান্ডিত্ম দেখাতে গেলেই বিপদ |তাই আমি বেশ সতর্ক| হঠাত্ কথা থামিয়ে আমাকে বললেন,রবীন্দ্রনাথ পড়েছো? বুঝে গেছি বিপদ আসন্ন | পড়েছি বললে কি জিজ্ঞাসা করবেন আমার দফারফা হয়ে যাবে | পড়িনি বললে মিথ্যে কথা হবে|বিশ্বাস করবেন না| তাছাড়া সাংবাদিকতা করি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পড়িনি, এটা কি করে হয় ?কায়দা করে বললাম,ওই স্কুল কলেজে নম্বরের জন্য যতটুকু পড়েছি |বেশ, বলেই আমাকে বললেন,একটা কবিতা আবৃত্তি কর | কথা শুনেই আমার গা ঘাম দিতে শুরু করেছে |প্রথমত,সেই কবে পড়েছি দ্বিতীয়ত,নৃপেন চক্রবর্তীর সামনে আবৃত্তি ! অনেক চেষ্টা করে এড়াতে না পেরে ছোট বেলায় ভালো মুখস্ত একটি কবিতা বলতে শুরু করলাম--- "আজিএ প্রভাতে রবির কর ......| তিনি চোখ বন্ধ করে আছেন|হঠাত্ বললেন,এই কি করছো ? মাঝের লাইনগুলো কোথায় গেলো? অকপটে ছাত্রের মত স্বীকার করলাম,ভুলে গেছি| ভাবলাম কপালে বকা আছে| না,তিনি নিজেই শুরু করলেন |একেবারে প্রথম থেকে শেষ অব্দি আবৃত্তি করলেন| আমি অবাক হয়ে শুনলাম| দেখলাম জানলাম তাঁকে অন্য ভাবে |গাড়ী এগিয়ে চলছে খোয়াইয়ের পথে |


 
Accessibility | Copyright | Disclaimer | Hyperlinking | Privacy | Terms and Conditions | Feedback | E-paper | Citizen Service
 
© aajkeronlinekagaj, Agartala 799 001, Tripura, INDIA.