Facebook Google Plus Twiter YouTube

পশ্চিমবঙ্গের পর এবার ত্রিপুরাতেও কি নিরবচ্ছিন্ন শাসন ব্যবস্থার কুফল ভুগতে হবে বামেদের?

দেবাশিস মজুমদার

রাজ্য সরকার থেকে সরে যেতে হয়েছে মাত্র ১৪ মাস আগে৷ তবে বিধানসভায় ১৬ জন বিধায়কের প্রতিনিধিত্ব রেখে বিরোধী দলের মর্যাদা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন বামেরা৷ কিন্তু লোকসভার ভোটের রায়ে এই মর্যাদা ও হারিয়েছে সিপিএম৷ তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার নীতি মেনে আগামী আরও প্রায় চার বছর বিরোধী দলের স্বীকৃতি থাকবে তাদের দখলে৷ কিন্তু বিধানসভার পর থেকে দলের ভাঙ্গন রুখতে যে মেলার মাঠ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে তা লোকসভার ভোট থেকে স্পষ্ট ৷ আগামী দিনের সিপিএম এর কাছে যতটা না রাজ্যের শাসক দল বিজেপি, তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে কংগ্রেস৷ এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের থিউরি মানে ত্রিপুরাতেও সিপিএম শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের সঙ্গে গাঁটছড়া বাদে কিনা সেটাই দেখার৷
এবারের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে ৬০ আসন বিশিষ্ট বিধানসভার একটিতেও জয়ের ধারে কাছে নেই সিপিএম৷ ভরাডুবি হয়েছে খোদ বিধানসভার বিরোধী দলের নেতা মানিক সরকারেরও৷ ১৬  জন বিরোধী বিধায়ক এর মধ্যে একজন নিজেদের গণভিত্তি ধরে রাখতে পারেননি৷ শাসক দল বিজেপির তুলনায় সিপিএম ভোটের নিরিখে পিছিয়ে রয়েছে অনেক দূর৷ এমনকি দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা কংগ্রেসের সঙ্গেও রয়েছে বিপুল ভোটের ব্যবধান৷ লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিম ত্রিপুরা আসনে বিজেপি প্রার্থী প্রতিমা ভৌমিক পেয়েছেন ৫ লক্ষ ৭৩ হাজার ৫৬২ ভোট৷ নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কংগ্রেসের সুবল ভৌমিক পেয়েছেন ২ লক্ষ ৭১ হাজার ৮২৬ ভোট৷ ফলে বিজেপি প্রার্থী প্রতিমা ভৌমিক এর তুলনায় সিপিএম প্রার্থী শংকর প্রসাদ দত্ত পিছিয়ে গেছেন ৪ লক্ষ ১ হাজার ৭০৬ ভোটের বিশাল ব্যবধানে৷ অন্যদিকে সুবল ভৌমিক এর তুলনায় সিপিএম প্রার্থী সি দত্ত পিছিয়ে রয়েছেন ৯৬ হাজারেরও বেশি ভোটে৷
পূর্ব ত্রিপুরা আসনে বিজেপি প্রার্থী রেবতী মোহন ত্রিপুরা পেয়েছেন ৪ লক্ষ ৮২ হাজার ১২৬ ভোট৷ এখানেও দ্বিতীয় স্থানে রইলেন কংগ্রেসের প্রজ্ঞা দেব বর্মন৷ তার প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ হলো ২ লক্ষ ৭৭ হাজার ৮৩৬৷ তৃতীয় স্থানে চলে গেছেন বিদায়ী সাংসদ জিতেন্দ্র চৌধুরী৷ আর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ২ লক্ষ ৯৬৩৷ এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রেবতী মোহন ত্রিপুরা থেকে ২ লক্ষ ৮১ হাজার ১৩৬ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন জিতেন্দ্র চৌধুরী৷  কংগ্রেসের প্রজ্ঞা দেব বর্মন এর থেকেও জিতেন্দ্র চৌধুরী ৭৬ হাজার ৮৭৩ কম ভোট পেয়েছেন৷
বলা বাহুল্য যে, ৬০ আসন বিশিষ্ট ত্রিপুরা বিধানসভার ৩০টি পশ্চিম ত্রিপুরা ও বাকি ৩০টি আসন রয়েছে পূর্ব ত্রিপুরায়৷ বর্তমানে বিধানসভায় ৩৬ জন বিধায়ক রয়েছেন বিজেপির ও ৮ জন বিধায়ক রয়েছেন শরিক দল আইপিএফটির৷ বাকি ১৬ জন বিধায়ক রয়েছেন বিরোধী সিপিএম এর৷ যে বিধানসভা কেন্দ্র গুলো থেকে সিপিএম বিধায়করা বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব করছেন সেগুলো হলো, ১৫ কমলাসাগর থেকে নারায়ন চৌধুরী,  ১৬ বিশালগড় থেকে বানু লাল সাহা, ২০ বক্সনগর থেকে শহীদ চৌধুরী, ২২ সোনামুড়া থেকে শ্যামল চক্রবর্তী, ২৩ ধনপুর থেকে মানিক সরকার, ২৫ বিশ্বাস, ৩৩ কাকড়াবন-শালগড়া থেকে রতন ভৌমিক, ৩৪ নগর থেকে সুধন দাস, ৩৭ ঋৃষ্যমুখ থেকে বাদল চৌধুরী, ৩৮ জুলাই বাড়ি থেকে যশোবীর ত্রিপুরা, ৩৯ মনু থেকে প্রভাত চৌধুরী, ৫২ চন্ডিপুর থেকে তপন চক্রবর্তী, ৫৩ কৈলাশহর থেকে মবস্বর আলী, ৫৪ কদমতলা কুর্তি থেকে ইসলাম উদ্দিন, ৫৫ বাগবাসা থেকে বিজিতা নাথ ও ৫৭ যুবরাজনগর থেকে রমেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ৷
সভা ভোটের হিসেব অনুযায়ী বাম বিধায়করা সকলেই পরাস্ত হয়েছেন৷ এমনকি অনেকেই তৃতীয় স্থানে চলে গেছেন৷ এই ফলের নিরিখে বিজেপি এককভাবে ৫১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে৷ কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে ৯ টি তে৷ ফলে এই মুহূর্তে বিধানসভা নির্বাচন হলে বামেদের আসন শূন্য হয়ে যাবে৷
দ্বিতীয় স্থান এর নিরিখে আলোচনা করলে দেখা যায়, ৬০ আসন বিশিষ্ট ত্রিপুরা বিধানসভার ৩৩টিতে এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস, সিপিএম এগিয়ে রয়েছে ১৭ টি তে ও বিজেপি এবং আইপিএফটি ৫টি করে মোট ১০টিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে৷
বামেদের কথিত দুর্গ হিসেবে খ্যাত ছিল ধনপুর, ঋৃষ্যমুখ, চন্ডিপুর সোনামুড়া বক্সনগর এর মত বিধানসভা কেন্দ্রগুলি৷ কিন্তু এই কেন্দ্রগুলিতে বামেদের অবস্থান তৃতীয় স্থানে গিয়ে ঠেকেছে৷ যেমন ধনপুর বিধানসভা আসনের কথাই ধরা যাক৷ ২০১৮  সালের নির্বাচনে এই আসনে সিপিএম প্রার্থী মানিক সরকারের ভোটের পরিমাণ ছিল ২২,১৭৬৷ লোকসভা ভোটে তার প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ হল ৪,৬৮৭৷ একই রকম অবস্থা হয়েছে বাদল চৌধুরী, তপন চক্রবর্তী, ভানু লাল সাহা, বিজিতা নাথ, শহীদ চৌধুরী দেরও৷
২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে লোকসভা ভোটের এই ফল বামেদের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের৷ কেননা জোটসঙ্গী আইপিএফটি কে ছাড়াই এই মুহূর্তে শাসক দল ৪৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ৫১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে৷ কংগ্রেস পেয়েছে ২৫ শতাংশ ভোট ও সিপিএম পেয়েছে ১৭  শতাংশ৷ বিধানসভা নির্বাচনের পর বামেরা যে এখনো ঘর গুছিয়ে উঠতে পারেনি, বরং ভাঙ্গন চলছে তা এবারকার লোকসভার ভোটের ফলাফল বলে দিচ্ছে৷ ফলে বিরোধী সিপিএম এর কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে কংগ্রেস৷ যদিও সংখ্যালঘু এবং জনজাতি অধ্যুষিত এলাকা তেই ফলাফল অপেক্ষাকৃত ভালো হয়েছে৷ তা সত্ত্বেও বলা চলে আগামী বিধানসভা নির্বাচন সিপিএমের কাছে একটা অস্তিত্ব রক্ষার একটা লড়াই৷ ফলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পর্যন্ত কংগ্রেসের হাত ধরে কিনা তা নিয়ে চলছে চর্চা৷
মাত্র দেড় বছর সময়ের মধ্যে শাসক দল থেকে লাফিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে আসার ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন তথ্য বিজ্ঞ মহল৷ তাদের অভিমত, এটা হল নিরবচ্ছিন্ন ২৫ বছরের শাসন ব্যবস্থার কুফল৷ যেমনটা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে৷ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক দলের ভূমিকা হওয়া উচিত সরকার এবং বিরোধী উভয় পক্ষে৷ টানা শাসন ব্যবস্থায় একটা সময়ে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা চরম আকার ধারণ করে৷ ফলে একবার পতন হলে সেখান থেকে দলকে টেনে তোলা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে৷ এই জায়গা থেকে বামেরা ত্রিপুরায় কবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এখন সেটাই দেখার৷


 
Accessibility | Copyright | Disclaimer | Hyperlinking | Privacy | Terms and Conditions | Feedback | E-paper | Citizen Service
 
© aajkeronlinekagaj, Agartala 799 001, Tripura, INDIA.