Facebook Google Plus Twiter YouTube
   
ময়ুর কোকিলের যুগলবন্দীর শহর ভাদোদরা হয়ে উঠছে বাংলা ও বাঙালির কৃষ্টির কেন্দ্রস্থল
প্রদীপ চক্রবর্তী , 25/05/2017, Agartala

কত রঙ বেরঙের পাখি।  একইসঙ্গে কোকিল আর ময়ূরের ডাক। চানক্য এলাকায় সাত সকালে ময়ূরের দল মেঠো পথে রোজ হেটে বেড়ায়। ডাক তো আছেই। সে এক  অদ্ভুত দৃশ্য । জীবনে যা দেখেনি। পেখম মেলে চলা সেই ময়ূর যেন দু'চোখ  চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে । এ যে অদ্ভূত সমাপতন! বর্ষা আর বসন্ত যেন একই সাথে!
ভাদোদারা, যে শহরের পূর্ব পরিচিতি বরোদা হিসেবে, সেটি গুজরাতের তৃতীয় বৃহত্তম শহর আহমেদাবাদ এবং সুরাতের পরেই। এটি ভাদোদারা জেলার সদর শহর। এর পাশেই  বিশ্বামিত্র নদী। বিমান, রেলপথ এবং সড়কপথে ভাদোদারা যুক্ত  দিল্লী এবং মুম্বই ছারাও অন্য শহরের সাথে।রাত ১২ টায় মুম্বই এ ট্রেন এ চাপলে ভোরে বরোদা।
দেশের প্রথম দশটি উন্নয়নশীল শহরের মধ্যে বরোদা অন্যতম। বরোদার মহারাজা তৃতীয় সয়াজীরাও গায়কোয়াড়ের সময় থেকেই বরোদা শিল্পকলায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। বর্তমানে এটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, সংস্কৃতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রস্থল। অনেক বড় বড় শিল্প যেমন – পেট্রোকেমিক্যাল, ইঞ্জিনীয়ারিং, কেমিক্যাল, প্লাস্টিক প্রভৃতি রয়েছে এখানে।
 বরোদার  ইতিহাস  বলে এই অঞ্চলে ৮১২ খ্রীস্টাব্দে বণিক শ্রেণীর লোকজন বসবাস করতে শুরু করে। সেই সময় অঞ্চলটি হিন্দু রাজাদের অধীন ছিল এবং ১২৯৭ সাল অবধি এই অঞ্চলে পর পর রাজত্ব করেছে গুপ্ত, চালুক্য এবং সোলাংকি রাজারা। দিল্লীতে সুলতানী আমল শুরু হলে,  শাসনভার চলে যায় সুলতানদের হাতে। এরপর দিল্লীতে মুঘল পর্ব শুরু। শুরুতেই এই অঞ্চলের শাসন নিয়ে মুঘলদের বেগ পেতে হয় কারণ, সে সময় মারাঠারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে ও এই অঞ্চলের দখল নেয়। তৃতীয় সয়াজীরাও গায়কোয়াড়ের আমলে – যিনি ১৮৭৫ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন – তাঁর সময় শাসন সংক্রান্ত প্রভূত উন্নতি  এখানে। ব্রিটিশের প্রতিপত্তি সত্ত্বেও বরোদা প্রিন্সলী স্টেট হিসেবে পরিগণিত হয় এবং স্বাধীনতার পর অন্যান্য প্রিন্সলী স্টেটের মত বরোদাও ১৯৪৭ এ ভারতভুক্তি হয়। অন্য রাজন্য শাসিত রাজ্য এিপুরাও ১৯৪৯ এ ভারতভুক্তি হয়।
বরোদার মহারাজ সয়াজীরাও গায়কোয়াড় একসময় ইংল্যাণ্ডে শিক্ষাগ্রহণ করতে যান এবং ইংল্যাণ্ডে পাঠকালে তাঁর সঙ্গে শ্রী অরবিন্দ ঘোষের সাক্ষাৎ হয়। হ্যাঁ, বিপ্লবী শ্রী অরবিন্দ ঘোষ - মাত্র সাত বছর বয়সেই তাঁর পিতা ডাক্তার কৃষ্ণধন ঘোষের সঙ্গে তিনি ইংল্যাণ্ড পাড়ি দেন এবং তাঁর ছাত্রজীবন ইংল্যাণ্ডেই অতিবাহিত হয়। পিতা কৃষ্ণধন শ্রী অরবিন্দকে পাকা সাহেব তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিধাতার অভিপ্রায়ে শ্রী অরবিন্দ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও হয়ে উঠলেন খাঁটি দেশপ্রমিক।
 ইংল্যান্ডে বরোদার মহারাজার সঙ্গে  শ্রী অরবিন্দের আলাপ ক্রমশঃ গভীর সখ্যতায় পরিণত হল। অরবিন্দ বরোদার মহারাজা সয়াজীরাও গায়কোয়াড়ের শিক্ষক ও প্রাইভেট সেক্রেটারি নিযুক্ত হলেন। ১৮৯৩ সালে বরোদার মহারাজার সঙ্গে একত্রে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন। চোদ্দো বছর পর দেশে ফিরে তিনি বরোদাতেই রইলেন, তখনও তিনি গায়কোয়াড়ের প্রাইভেট সেক্রেটারি। এই বরোদাতেই সিস্টার নিবেদিতার সংস্পর্শে আসেন শ্রী অরবিন্দ। তাঁদের সাক্ষাৎকার ভারতীয় বিপ্লবের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বরোদার মহারাজার সংগে শ্রী অরবিন্দের ঘনিষ্ঠতা নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

বরোদা অর্থাৎ অধুনা ভাদোদারাও যে বাংলা ও বাঙালির কৃষ্টির কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠবে এতে আর সন্দেহের অবকাশ নেই ।  বরোদার জীবনযাত্রা মুম্বইয়ের মত এমন দ্রুত ধাবমান নয়। এই সুন্দর সুপরিকল্পিত শহরটায় বেশিরভাগ মানুষের বসবাস তাদের কর্মস্থলের কাছাকাছি। কাজেই অফিসের কাজকর্ম মিটিয়ে হয়তো তাঁরা একটু সময় বের করতে পারেন মনের রসদ সংগ্রহ করার কাজে। তাই গানবাজনা, নাটক, চারুকলা ইত্যাদি চর্চায় অতিবাহিত হয় কিছু সময়। তাঁরা পিছিয়ে নেই মাতৃভাষা প্রসার বা চর্চার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজেও।
মমত্ববোধ। অথচ মাতৃভাষা বিশ্বের সকল মানুষের কাছে অপরিহার্য নিজেকে প্রকাশ করার জন্য।  বরোদা বা ভাদোদারার বাঙালিরা মাতৃভাষা প্রসারে যথেষ্ট আগ্রহী এবং পুরোদমে সে কাজ শুরুও করে দিয়েছেন।  এই বছরের  ১২ই জানুয়ারি স্বামী  বিবেকানন্দের জন্মদিবসে ‘মাতৃভাষা প্রসার সমিতি’র উদ্বোধন হয়। সমিতির চেয়ারম্যান প্রবীণ ব্যক্তি শ্রী অশোক গুপ্ত মাতৃভাষা প্রসারের কাজে একনিষ্ঠ কর্মী। শুধু বাংলা নয়, গুজরাতি এবং হিন্দি ভাষা শেখানোর কাজও এঁরা্ শুরু করেছেন। শেখার ব্যাপারে কোন বয়ঃসীমা নেই। একটি নির্দিষ্ট পাঠক্রম অনুসারে ভাষাশিক্ষা দেওয়া হয়। আয়োজন করা হয়। সেমিনার বা ওয়ার্কশপের। ভাদোদারার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে উৎসাহী ও ইচ্ছুক ব্যক্তিদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়।
শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পত্র পত্রিকা প্রকাশ ইত্যাদি কর্মসূচিও গ্রহণ করবেন তাঁরা। পথচলা যখন শুরু হয়েছে তখন গন্তব্যে কোনও না কোনও সময় নিশ্চই পৌঁছনো যাবে। বর্তমানে মাতৃভাষা প্রসার সমিতির শিক্ষার্থীর সংখ্যা চৌষট্টি। বাংলা, গুজরাতি এবং হিন্দি এই তিনটি শাখায় শিক্ষকের সংখ্যা আট। এই সংস্থার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা হল অন্য রাজ্যেও মাতৃভাষা প্রসারের কাজে আত্মনিয়োগ করা এবং এ ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী যে, অন্যান্য রাজ্যেও বসবাসকারী বাঙালিরা নিশ্চই তাঁদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেন। ভাদোদারার ‘মাতৃভাষা প্রসার সমিতি’র চলার পথ সুগম হবে, এই প্রত্যাশা ।
শহরের মধ্যে সয়াজী বাগ এক বিশাল বড় উদ্যান যার মধ্যে রয়েছে চিড়িয়াখানার, টয়ট্রেণ এবং চিত্র সংগ্রহশালা। টয়ট্রেনটি তো ভারী চমৎকার। ছোট্ট স্টেশনটির নাম স্বামী বিবেকানন্দ স্টেশন। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি স্বামীজীও কিন্তু পরিব্রাজক হয়ে বরোদায় এসেছিলেন। সেই হিসেবে বরোদা মহাপুরুষদের পদধূলিধন্য পুণ্যভূমি। যাই হোক, যা বলছিলাম। টয়ট্রেনটি ছোটদের তো বটেই, বড়দেরও মনোরঞ্জন করবে। সয়াজীবাগকে গোল হয়ে ঘুরে আসে ট্রেনটি। কত রকমের গাছ গাছালিতে ভর্তি এই উদ্যান। সত্যি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। ট্রেন থেকে নেমে চিড়িয়াখানা দেখার পালা। যদিও টয়ট্রেনটি কিছুটা চিড়িয়াখানার মধ্য দিয়েই যায় ।  তবে চিড়িয়াখানায় ঘুরলে  নিরাশ হবেন না। নানা দেশের নানা. প্রজাতির পাখি দেখতে দেখতেই অনেক সময় চলে যাবে। এছাড়াও কুমির, নানা প্রজাতির হরিণ, নীলগাই,  লেপার্ড, চিতা, বাঘ, সিংহ প্রভৃতি বন্যপ্রাণীও রয়েছে।  টেলিভিশনের এ্যানিমাল প্ল্যানেটের লেপার্ড, বাঘ, সিংহকে একেবারে জীবন্ত অবস্থায় চোখের সামনে দেখা তো আর মুখের কথা নয়! বিস্ময়ে হতবাক হওয়ার অবস্হা ।বাঘ দেখার উৎসাহেই দেড় দু কিলোমিটার পথ হাঁটা।   এই চিড়িয়াখানাতেই দেখলাম ময়ূরের পেখম মেলার অনবদ্য দৃশ্য। তাও আবার দুধের মত সাদা ময়ূর।
তবে হ্যাঁ, যেদিন সয়াজী বাগ দেখেছি তার আগের দিন দেখে নিয়েছিলাম আর একটি সংগ্রহশালা এবং রাজপ্রাসাদ। সঢডে মহারাণী তাকে দত্তক নেওয়ার আগে জিগ্যেস করেছিলেন, ‘তুমি জানো তোমাকে এখানে কিজন্য নিয়ে আসা হয়েছে?’ গোপালরাও উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কেন, অবশ্যই মহারাজা হওয়ার জন্য’। মর্নিং শোজ দ্য ডে। সত্যিই গোপালরাও এরপর সয়াজীরাও নামে বরোদার রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হন। একশোবাইশটি তোপধ্বনি  দিয়ে শুরু হয় অভিষেক অনুষ্ঠান। মিঠাই বিতরণ করা হয় সকলকে, দরিদ্রদের ভোজন করানো হয়। তাঁর বহু পদবীর মধ্যে প্রথমটি ছিল, ‘হিজ হাইনেস মহারাজা সয়াজীরাও গায়কোয়াড়, সেনা খাস খেল, শামশের বাহাদুর’। মহারাজার স্মৃতিধন্য বরোদা – আজকের ভাদোদারা শহর।
 

 
Accessibility | Copyright | Disclaimer | Hyperlinking | Privacy | Terms and Conditions | Feedback | E-paper | Citizen Service
 
© aajkeronlinekagaj, Agartala 799 001, Tripura, INDIA.