Facebook Google Plus Twiter YouTube
   
একটি নাটক (আত্মপ্রচার কিংবা আত্মপরিচয়, সঙ্গে তাহাদের কথা)
অশোক দেব , 27/05/2017, Agartala

একটি বক্তৃতা পড়েছিলাম সুধীর চক্রবর্তী মহোদয়ের। ‘লোকসমাজ ও লোকচিত্র’। তাতে আমার মনোভাবের দারুণ সমর্থন পেয়েছিলাম। কারণ, তা পাঠের আগেই, এমনকি সমাজবিজ্ঞান ও তৎসংক্রান্ত দাঁতভাঙা প্রবন্ধাদি পাঠ করবার আগেই, আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি ‘লো কালচার’এর লোক। ‘হাই কালচার’ আমার পেটে সয় না, ‘পপ কালচার’ আমার মনে গাঁথে না। ‘লো কালচার’ -এর এইসব মানুষ যারা কথায় কথায় অপরকে মাতৃগমণকারী বলে গালি দেয়, তারাই আমি। কারণ, তারা স্বাভাবিক।তাদের ঠাকুর দেবতা, ঈশ্বর আসলে আকাশের পারের কেউ নন। তারা এদের সংসারের মানুষ।বিনয় ঘোষ মহাশয়ের বরাত দিয়ে শ্রীসুধীর চক্রবর্তী সঠিক বলেছেন, এরা কেউ হিন্দু নয়, মুসলিম নয়। ‘একে বলে কালচারাল অসিলেশন।ঘড়ি যেমন ঘোরে, পাখা ঘোরে, তেমনই কালচারাল অসিলেশন। সংস্কৃতি একবার এদিকে যাচ্ছে, একবার ওদিকে যাচ্ছে। একবার সমীরের দিকে যাচ্ছে, আর একবার সমীরুদ্দিনের দিকে যাচ্ছে’। এদের মধ্যে সম্প্রীতির চর্চা নেই। কারণ, ওটি ওদের এমনি আছে। বাইরে থেকে সাজানো সম্প্রীতির দরকার হয় না। ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে গিয়ে শ্রীচক্রবর্তী ঠিকই শুনে আসেন, ‘দোহাই বাবু, সম্প্রীতির হাত থেকে আমাদের বাঁচান।আপনারা সম্প্রীতি বলে কী বলতে আসেন মাঝে-মাঝে, ঐটা নিয়ে বড় বিপদে পড়ে গেছি। ঐটা আমাদের বরাবরই আছে... আপনাদের শহরে গিয়ে আগে সম্প্রীতি তৈরি করুন, তারপর এখানে আসবেন’। আজকাল এই কথাগুলো কত প্রাসঙ্গিক। একদল ‘হিন্দু হিন্দু’ বলছে, একদল ‘ইসলাম ইসলাম’ বলছে। উপমহাদেশে এদের দৌরাত্ম্যে সম্প্রীতি নয় মানবধর্মই বিপন্ন। আরেকদল তেড়ে ধর্মের বাপান্ত করে, নিজেরা ওইসব সমীর ও সমীরুদ্দিন উভয়ের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছে। কারণ, ধর্মভিত্তিক রুজি চলে গেলে এরা করবে কী? 
নিজেকে ভৈরব ভাবে সদানন্দ। 'ধ্যানে কৈলাস যায় না আল্টুপাল্টূ মানুষ'
এইসব পড়ার আগেই আমি নিজেকে পড়েছি। আর বসে থেকেছি অমূল্যদার চায়ের দোকানে।(অমূল্যদা আছেন, দোকানটা নেই)। মুনশিবাড়ির তবজলের সঙ্গে, আব্দুল রবের সঙ্গে, সুবেদ আলির সঙ্গে আমার চিরসখ্য। সখ্য তরুণের সঙ্গে, অনুপ অলকের সঙ্গে। গাজনের দলের খোঁড়া সুবলের কাছেই শুনেছি, ‘ভগবান আসলে যোনি আর লিঙ্গ, ভগ আর বাণ!’ তাই ওদের কথাই লিখি। এরা সবে মিলে এক। তাই আমার সকল অক্ষম গল্পের নায়ক এক, সদানন্দ।
যখন লিখেছি, বই প্রকাশ হয়েছে, কেউ পড়লেন কিনা জানতাম না। আমাদের রাজ্যে পাঠ করে প্রতিক্রিয়া খুব কম লোক জানান। কেউ দুটি কথা কোথাও লেখেনি। একদিন মোবাইল ফোন এলে পরে এদিক ওদিক হতে ফোন আসতে শুরু হল। এরপর কতকাল কেটে যায়। ‘লিখে কী হবে’ বলে ছেড়ে দিই। কিন্তু লেখা সেই প্রণয়িনী, যাকে এমনকি ঘৃণা করা যায়, ত্যাগ করা যায় না। এমনি একটি গল্প ‘ঝাঁপ’। আমাকে একদিন চমকে দিয়ে ফোন এল, ‘দাদা এটার নাট্যরূপ হচ্ছে, জানো?’ জানতাম না। এরপর, ‘দাদা, অমুক তারিখে শো, তোমাকে চাই’। বাড়ি এসেও বলে যান পরিচালক। ভয় হচ্ছিল, এরা শহুরে, আমার লোকজনকে বিকৃত করে দেবে না তো!
 
দেখেছি এদের দাপট, এত স্বাভাবিক অভিনয় বহুদিন বাদে
দেয়নি। উত্তম অসাধারণ কাজ করেছে। বেসিক সব টেকনিক, স্বাভাবিক অভিনয় দিয়ে ওরা সাজিয়েছে নাটকটি। গল্পটিকে একটুও বদল করেনি, কেবল দু একটি চরিত্রকে বিশদ করে নিয়েছে। তাতে আরও খোলতাই হয়েছে।আমি নাটক দেখতে যাইনি বলে, নাটক নিয়েই ওরা চলে এলো আমার শহরে। আমাদের অনুজ অভিজিৎ দাস ও তার দল এ নাটক আমার শহরে আনার উদ্যোগ নিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে বেঁধেছে। দেখে আমি থ। বাধা নেই বলতে, কেঁদেই ফেলেছি লুকিয়ে। কী অভিনয় করেছে সেই খোঁড়ার চরিত্রে ছেলেটি! দুটি কন্যা নিজেদের সৌন্দর্যের নাগরিক রূপ ফেলে দিয়ে কেমন গোমতীপাড়ের হয়ে গেলো! গান, আলো, সুর সবই স্বাভাবিক। কেবল সম্পাদনাতে আরও একটু নিষ্ঠুর হলেই আরও টানটান হয়ে যেতো।
নাটক করতে গিয়ে ওরা ‘ঝাঁপ’ নামটি পাল্টে দিয়ে ‘এ লোক, সে লোক’ করেছে। ভালোই হয়েছে। সদার জীবনে দুই লোক। এই কঠোর বাস্তব আর তার কল্পনার জগৎ। আবার ভানুও বাস্তবে ‘পুরুষ লোক’ কিন্তু সদানন্দের কাছে সে অন্য মানুষ ভৈরবী। শিল্পের প্রতি লোকমানুষের যে ডেডিকেশন, তাতে এমনকি সেট করা সব অভিধা পাল্টে যায়, যৌনতাও। এ জিনিসটা খুব যথার্থ ফুটিয়েছে ‘রাঙামাটি’ নাট্যদল।
পুরনো লেখাগুলি কখনও বিদ্বজনেরা উলটে দেখেননি আমার। অভিমান ছিল না। আমি যাদের সঙ্গে মিশি, তাদের কাছ থেকে মস্ত উপেক্ষা শিখেছি। কিন্তু, আজকের যৌবন যখন এদের গ্রহণ করে, কাজ করে, তখন মনে হয় ভুল করিনি।

 

 
Accessibility | Copyright | Disclaimer | Hyperlinking | Privacy | Terms and Conditions | Feedback | E-paper | Citizen Service
 
© aajkeronlinekagaj, Agartala 799 001, Tripura, INDIA.