Facebook Google Plus Twiter YouTube
   
অবসাদ মোকাবিলায় যোগ
রাজভি এইচ মেহতা, 13/06/2017, Mumbai

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ২০১১ সালে  মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে যে আন্তর্জাতিক সমীক্ষা করেছিল তাতে জানা গেছে যে ভারতে অবসাদগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। যা সবচেয়ে উদ্বেগের সেটা হল এই সংখ্যা দিন দিন আমাদের দেশে সব বয়সের মানুষের মধ্যে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে স্বাচ্ছন্দপূর্ণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত সমস্ত ধরণের অর্থনৈতিক সঙ্গতির মানুষের মধ্যেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। আরও যা উদ্বেগের বিষয় তা হল, অবসাদগ্রস্ত এই সমস্ত মানুষেরা কখনও কখনও আবেগতাড়িত হয়ে নিজেদের জীবন পর্যন্ত শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ভারতে কিশোর এবং কম বয়সী যুবকদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে অবসাদের সমস্যাকে যথাযথভাবে মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।


কোন ব্যক্তির মধ্যে অবসাদের সূচনা হয় স্কুলে প্রথম না হওয়া, পরীক্ষায় প্রত্যাশিত নম্বর না পাওয়া অথবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা না করতে পারার মতো কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে। এছাড়াও, ক্যান্সার বা স্নায়ু রোগের মতো কিছু রোগের কবলে পড়ে মানুষের মধ্যে অবসাদ আসে। তবে, এই ধরণের রোগের নিরাময় বা চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে অবসাদ কমে আসে।
তবে, অবসাদের যে কারণই থাকুক না কেন, এর লক্ষণগুলি মোটামুটি খুবই সাধারণ। অবসাদগ্রস্ত মানুষের মধ্যে সাধারণভাবে যে সব শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তা হল, কাঁধ ঝুঁকে পড়া এবং নিচু বুকের খাঁচা। মানসিকভাবেও তাঁরা বেশ অস্থিরতায় ভোগেন এবং জীবনের প্রতি উদাসীন থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে অবসাদের এই পর্যায় নিজে থেকেই চলে যেতে পারে, আবার, কোন কোন সময় তা দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে।


অবসাদের ধরণ :
    অবসাদ অনেক ধরণের হতে পারে।
    প্যাথোলজিক্যাল বা বিকারতত্ত্বীয় অবসাদ অথবা শারীরবৃত্তিয় অবসাদ : কোন দীর্ঘস্থায়ী বা মারণ রোগের ফলে এই ধরণের বিষণ্নতা বা অবসাদ দেখা দিতে পারে। এমনকি, কোন ওষুধপত্রের প্রভাবেও অবসাদ আসতে পারে।
    আশাহত হয়ে অথবা ব্যর্থতাজনিত অবসাদ : যখন কোন ব্যক্তির প্রত্যাশা পূরণ হয় না, তখনই এই ধরণের অবসাদ আসতে পারে। যেমন, একজন ছাত্র অথবা একজন ক্রীড়াবিদ পরীক্ষায় বা খেলার মাঠে আশানুরূপ ফলাফল করতে পারল না। এক্ষেত্রে এই ধরণের অবসাদ আসতে পারে। এই পর্যায়টি ক্ষণস্থায়ী হলেও খুব দ্রুত এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন, যাতে পরবর্তী পর্যায়ে পড়াশোনা বা খেলাধূলার কোন ক্ষতি না হয়।
    আবেগজনিত অবসাদ : সম্পর্ক ভেঙে গেলে এই ধরণের অবসাদ আসতে পারে। যেমন, দু’জন মানসিকভাবে অত্যন্ত নিকটে থাকার মধ্যে মৃত্যু বা অন্যান্য কারণে প্রিয়জনকে হারালে এই ধরণের অবসাদ আসতে পারে।
    আত্মকেন্দ্রিক অবসাদ : ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের জায়গা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেই এই ধরণের অবসাদ আসতে পারে। যখন তাঁরা দেখেন যে একদিন যে ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব তাঁরা ভোগ করতেন তা আর নেই, তখনই তাঁরা অবসাদে ভুগতে শুরু করেন। চাকরি জীবনে অবসরগ্রহণের কাছাকাছি সময়ে এই ধরণের অবসাদ দেখা দিতে পারে।
অবসাদ মোকাবিলায় যোগ
    যোগকে মন এবং আবেগের বিজ্ঞান বলা হয়। ফলে, অবসাদের লক্ষণগুলি অতিক্রম করার ক্ষেত্রে যোগ বিশেষ ফলপ্রসূ হতে পারে। তবে, ব্যক্তি বিশেষের লক্ষণ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
    যেহেতু কোন মানুষের মানসিক এবং আবেগগত অবস্থান তাঁর অঙ্গভঙ্গির মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, তাই এই অঙ্গভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আবেগগত অবস্থারও পরিবর্তন সম্ভব। এক্ষেত্রে অবসাদগ্রস্ত মানুষটির জন্য বিশেষ ধরণের যৌগিক আসন উপযোগী হতে পারে। এসব আসনের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী হলেও, নির্দিষ্ট সময় ধরে নিয়মিত এই আসনগুলি করলে তার প্রভাব স্থায়ী হতে পারে এবং মানুষটির মধ্যে পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তিনি অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে পারেন।


    অবসাদগ্রস্ত রোগীদের জন্য যে বিভিন্ন ধরণের আসন রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে ‘ঊর্ধ্ব ধণুরাসন’, ‘বিপরীত দণ্ডাসন’-এর মতো কয়েকটি আসন যেখানে শরীরের পশ্চাৎবর্তী সম্প্রসারণের কথা বলা হয়। এই আসন দুটিতে সংশ্লিষ্ট মানুষটির কাঁধকে পিছন দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বুক সামনের দিকে উঁচু করে রাখতে বলা হয়। এর ফলে, অবসাদগ্রস্ত রোগীর চিরাচরিত শারীরিক ভঙ্গিমার মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। তবে, মনে রাখা দরকার যে এই সব আসন তাৎক্ষণিকভাবে করা সম্ভব নয়। মেরুদণ্ডকে পিছনের দিকে বাঁকানোর জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন।
    এজন্যই প্রাথমিকভাবে প্রস্তুতি পর্বে ‘ত্রিকোণাসন’, ‘পার্শ্বকোণাসন’ এবং ‘অর্ধ চন্দ্রাসন’-এর মতো দণ্ডায়মান অবস্থায় আসনগুলির কথা বলা হয়। এই আসনগুলি করা হলে মেরুদণ্ড শক্তিশালী হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে পিছনের দিকে মেরুদণ্ডকে বাঁকিয়ে আসনগুলি করা সম্ভব। যেমনটা আগে উল্লেখ করা হয়েছে, এইসব আসনের ফল পেতে গেলে নির্দিষ্ট সময় ধরে এই আসনগুলি করতে হবে। কিন্তু অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় কোন কিছু করার মানসিকতাই মানুষের থাকে না। এই ধরণের ক্ষেত্রে যোগাচার্য্য বি কে এস আয়েঙ্গার সমস্যা মোকাবিলা অন্য কথা ভেবেছেন। তিনি অভিনব পদ্ধতিতে বাড়িতে থাকা গোটানো চেয়ার ব্যবহারের কথা বলেছেন। এই চেয়ারের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি সহজেই বিপরীত দণ্ডাসনের মতো আসন করতে পারবেন। এই আসন করলে মানুষের মন থেকে অস্থিরতা দূর করা সম্ভব।
    এই ধরণের বিপরীত আসনগুলি মানুষের মধ্যে অবসাদের লক্ষণগুলি অতিক্রমে সাহায্য করে। এই আসনগুলির মধ্যে রয়েছে – ‘অধোমুখো বৃক্ষাসন’, ‘পিঞ্চাময়ূরাসনশীর্ষাসন’, ‘সর্বাঙ্গাসন’ এবং ‘সেতুবন্ধসর্বাঙ্গাসন’। এই সবক’টি আসনেই মাথার অবস্থান থাকে হৃদয়ের নিচে। এই আসনগুলি অবসাদগ্রস্ত মানুষের মধ্যে মানসিক ভীতি কাটাতে সহায়তা করে। এই ভীতিগুলির মধ্যে রয়েছে – ক্ষয়ক্ষতি, ব্যর্থতা বা ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব হারানোর ভীতি।


    বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় জানা গেছে যে সপ্তাহে দু’দিন যোগাভ্যাস এবং বাড়িতে তা নিয়মিত অভ্যাস করলে অবসাদের লক্ষণ কমানো সম্ভব।
    প্রত্যেকটি আসনের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের নিজস্ব ধরণ রয়েছে, যা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিখতে হয় এবং ‘দম’-এর ব্যাপারে সচেতন হতে হয়। ‘দম’ বিষয়ে সচেতনতা সহ এই আসনগুলি করা হলে তবেই অভ্যাসকারী এই আসনগুলির সঙ্গে মানসিকভাবে সংযুক্ত হতে পারেন। যে সব আসনে দীর্ঘ সময় ধরে দম ছাড়তে হয়, সেগুলি মানুষের মধ্যেকার উত্তেজনা কমানোর সহায়ক। অন্যদিকে, যে সব আসনে দীর্ঘ সময় ধরে দম নিতে হয়, তা মানুষের মধ্যে সাহসিকতা বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক হয়।


*লেখিকা : মুম্বাইয়ের আয়েঙ্গার যোগাশ্রয়ের একজন বরিষ্ঠ যোগ-শিক্ষিকা
 

 
Accessibility | Copyright | Disclaimer | Hyperlinking | Privacy | Terms and Conditions | Feedback | E-paper | Citizen Service
 
© aajkeronlinekagaj, Agartala 799 001, Tripura, INDIA.